Travellers Tales Fresh Articles Every Day Your Daily Source of Fresh Adventure unleash the traveler in you

Edit Template

বাংলার সাদা সোনা: পনিরের স্বাদ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য

আমাদের দেশে পনির বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধবধবে সাদা, কিছুটা নোনতা আর স্পঞ্জি এক টুকরো খাবার। বিকেলের নাস্তায় পনির-বিস্কুট হোক বা ঢাকাই বিরামহীনের আভিজাত্য—পনির আমাদের খাদ্যসংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলার পনিরের ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরনো। ধারণা করা হয়, পর্তুগিজরা যখন এই বাংলায় (বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও ঢাকা অঞ্চলে) বসতি স্থাপন করে, তারাই পনির তৈরির কৌশল এদেশীয়দের শেখায়। পরবর্তীতে এদেশীয় কারিগররা তাদের নিজস্ব ঢঙে এটি তৈরি শুরু করেন। সেই থেকেই ‘ঢাকাই পনির’ বা স্থানীয় পনিরের জয়যাত্রা।

বিদেশের চিজ বা প্রক্রিয়াজাত পনিরের চেয়ে আমাদের দেশি পনির একদম আলাদা:

তৈরির প্রক্রিয়া: গরুর খাঁটি দুধকে লেবুর রস বা ছানার টক জল দিয়ে জমিয়ে এটি তৈরি করা হয়। পরে বাঁশের ঝুড়িতে রেখে বাড়তি জল ঝরিয়ে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়।

স্বাদ: এটি সাধারণত নোনতা স্বাদের হয়।

বুনন: বেশ শক্ত এবং ছোট ছোট ছিদ্রযুক্ত।

বর্তমানের বিখ্যাত পনির ও এলাকা

বর্তমানে বাংলাদেশে কয়েকটি নির্দিষ্ট এলাকার পনির তাদের গুণগত মান ও স্বাদের জন্য দেশজুড়ে সমাদৃত:

এলাকাপনিরের নামবিশেষত্ব
কিশোরগঞ্জ (অষ্টগ্রাম)অষ্টগ্রামের পনিরএটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বিখ্যাত পনির। মুঘল আমল থেকে এর সুনাম। এটি অত্যন্ত নরম এবং স্বাদ বেশ কড়া। বর্তমানে এটি জিআই (GI) পণ্যের স্বীকৃতির দাবিদার।
ঢাকা (পুরাতন ঢাকা)ঢাকাই পনিরচকবাজার বা তাঁতীবাজারের পনির ঐতিহ্যবাহী। এটি কিউব আকারে বা গোল চাকা হিসেবে পাওয়া যায়। বাকরখানির সাথে এর জুটি বিশ্বখ্যাত।
সিলেটসিলেটি পনিরমূলত বড়লেখা ও মৌলভীবাজারের পাহাড়ী এলাকায় সুস্বাদু পনির তৈরি হয়, যা স্থানীয় বাজারে বেশ জনপ্রিয়।

আপনি যখন কিশোরগঞ্জের হাওর বা পুরান ঢাকার অলিগলি ভ্রমণ করবেন, তখন সেই এলাকার পনিরের স্বাদ নেওয়া মানে সেই জনপদের ইতিহাসকে চেখে দেখা। পর্যটকদের জন্য এই পনির শুধু খাবার নয়, বরং একটি ‘এডিটিং স্যুভেনিয়ার’

মুঘল আমল ও পনিরের ‘আভিজাত্য’

উপহার হিসেবে আদান-প্রদান: অষ্টগ্রামের পনির এতই সুস্বাদু ছিল যে, দিল্লির দরবারেও এটি উপঢৌকন হিসেবে পাঠানো হতো। বিশেষ করে বাংলার সুবেদাররা দিল্লির সম্রাটদের সন্তুষ্ট করতে মাঝেমধ্যেই উপাদেয় এই সাদা পনির পাঠাতেন।

বাকরখানির অবিচ্ছেদ্য অংশ: মুঘল আমলে ঢাকার নবাব এবং সুবেদারদের সকালের নাস্তায় ‘পনিরি বাকরখানি’ ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। বলা হয়, খাঁটি ঘিয়ে ভাজা গরম বাকরখানির সাথে লবণাক্ত ঢাকাই পনিরের যে ‘সল্টি অ্যান্ড ক্রাঞ্চি’ কম্বিনেশন, তা সরাসরি মুঘল হেঁশেল থেকেই এসেছে।

ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে পনির: সেই যুগে ফ্রিজ ছিল না, তাই দীর্ঘ সফরের সময় মুঘল সেনারা প্রোটিনের উৎস হিসেবে পনির সাথে রাখতেন। লবণ দিয়ে কড়াভাবে জমানো পনির অনেকদিন ভালো থাকত বলে এটি ছিল তাদের আদর্শ ‘ট্রাভেল ফুড’।

পনির নিয়ে কিছু ‘মজার ও অজানা’ তথ্য

জিআই (GI) পণ্যের দৌড়: কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের পনির বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির অপেক্ষায় আছে। এটি হলে আন্তর্জাতিক বাজারেও এই পনিরের কদর বহুগুণ বেড়ে যাবে।

বাঁশের ঝুড়ির রহস্য: আপনি লক্ষ্য করবেন দেশি পনিরের গায়ে ছোট ছোট দাগ বা ছিদ্র থাকে। এটি আসলে নকশা নয়! পনির জমানোর জন্য এক বিশেষ ধরনের ছোট বাঁশের ঝুড়ি (যাকে স্থানীয়রা ‘ঢাকি’ বলে) ব্যবহার করা হয়। সেই ঝুড়ির ছাপই পনিরের গায়ে স্থায়ী হয়ে যায়, যা এর আসল হওয়ার প্রমাণ।

সিলেটের ‘হাওর স্পেশাল’ পনির: সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চলে মহিষের দুধের পনির তৈরি হয়। গরুর দুধের চেয়ে মহিষের দুধের পনির অনেক বেশি ঘন, চর্বিযুক্ত এবং সাদা হয়। এর স্বাদ সাধারণ পনিরের চেয়ে অনেক বেশি কড়া।

পনিরের ‘লাইফস্প্যান’: সাধারণত খাবার পচে যায়, কিন্তু ভালো মানের পনির লবণ-পানিতে ডুবিয়ে রাখলে মাসের পর মাস ভালো থাকে। এমনকি অনেক পুরনো পনিরের স্বাদ আরও বাড়ে বলে অনেকে মনে করেন।

পর্যটকদের জন্য একটি ‘ফুড ম্যাপ’ আইডিয়া

“কোথায় পাবেন সেরা পনির?”
১. পুরান ঢাকার চকবাজার: এখানে বংশপরম্পরায় পনির বিক্রি হচ্ছে।

২. অষ্টগ্রামের বাজার: সরাসরি কারিগরদের কাছ থেকে একদম টাটকা পনির কেনার অভিজ্ঞতা অতুলনীয়।

৩. বিখ্যাত মিষ্টির দোকান: বাংলাদেশের বড় বড় মিষ্টির চেইন শপগুলোতেও এখন প্রিমিয়াম কোয়ালিটির পনির পাওয়া যায়।

“পনির কেবল একটি খাবার নয়, এটি বাংলার ইতিহাসের এক নোনতা সাক্ষী। মুঘল সম্রাট থেকে আজকের ফুড ব্লগার—সবাইকে এই এক টুকরো পনির তার স্বাদে আটকে রেখেছে।”

Share Article:

Mridha Shihab

Writer & Blogger

All content published on Jatrik Blog is the intellectual property of the respective authors. Jatrik Blog serves as a platform for sharing these personal travel experiences with the world.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

যাত্রিক - Jatrik

যাত্রিক-এ আমরা বিশ্ব আবিষ্কারের প্রতি গভীর আগ্রহী এবং মনোমুগ্ধকর ব্লগ এবং ভ্লগের মাধ্যমে ভ্রমণের আনন্দ শেয়ার করি। আমাদের মিশন হলো সহযাত্রী ভ্রমণকারীদের মধ্যে ভ্রমণের ইচ্ছা জাগানো, প্রয়োজনীয় পরামর্শ, চমৎকার দৃশ্যাবলি এবং আমাদের অভিযানের প্রামাণিক গল্পের মাধ্যমে।

আপনার ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আমাদের পাঠান, যাতে তা জাত্রিক বাংলা ব্লগে শেয়ার করা যায়। লেখা পাঠান এই ঠিকানায়ঃ

jatrik.com@gmail.com

ইন্সটাগ্রাম এ ফলো করুন

সর্বোশেষ পোস্ট সমূহ

  • All Post
  • ঐতিহাসিক
  • খাবার গল্প
  • পাহাড় ও পর্বত
  • ফটোগ্রাফি
  • বাংলাদেশ
  • বিদেশ ভ্রমন
  • ভ্রমন
  • সংস্কৃতি

Visit kunjori

for your desired jewellery collection

আমাদের সাথে যোগ দিন

ণিউজলেটার এর জন্য সাইন আপ করুন

You have been successfully Subscribed! Ops! Something went wrong, please try again.
Edit Template

যাত্রিক

স্বাগতম যাত্রিক ব্লগ সাইটে, যা আপনার যাত্রার প্রেরণা, গল্প এবং পরামর্শের নির্ভরযোগ্য স্থান। যাত্রিক ইভেন্টস অ্যান্ড ট্রাভেলস-এর একটি সহযাত্রী প্রতিষ্ঠান হিসেবে, আমরা আপনাকে বাংলাদেশের জনসাধারনের হৃদয়ের কাছাকাছি নিয়ে আসার লক্ষ্যে কাজ করছি।

সাম্প্রতিক পোস্ট

  • All Post
  • ঐতিহাসিক
  • খাবার গল্প
  • পাহাড় ও পর্বত
  • ফটোগ্রাফি
  • বাংলাদেশ
  • বিদেশ ভ্রমন
  • ভ্রমন
  • সংস্কৃতি

সোশাল মিডীয়া লিঙ্ক

© 202৪ Copyright Jatrik.com